পাকিস্তান

চীন নিয়ন্ত্রিত বন্দরের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন বন্দরের প্রস্তাব

দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর পাসনিতে মার্কিন বিনিয়োগে নতুন একটি বন্দর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান, যা অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রফতানিতে সহায়ক হতে পারে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর পাসনিতে মার্কিন বিনিয়োগে নতুন একটি বন্দর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান, যা অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রফতানিতে সহায়ক হতে পারে। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন হলে আরব সাগরের উপকূলে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরো তীব্র হতে পারে। কারণ কাছাকাছি অঞ্চলেই রয়েছে চীন নিয়ন্ত্রিত গদর বন্দর। খবর নিক্কেই এশিয়া।

খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর সঙ্গে পাসনিকে যুক্ত করতে একটি বন্দর ও রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে পাকিস্তানের। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২০ কোটি ডলার, এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেবে যুক্তরাষ্ট্র।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাকিস্তান টিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে দেশটির কর্মকর্তারা বলেন, প্রস্তাবটি এখন পর্যন্ত শুধু প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।

প্রস্তাবিত পাসনি বন্দরনগরে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের বসবাস। এটি গদর থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত, যেখানে রয়েছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিসিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা গদর বন্দর। এখানকার বন্দর, বিমানবন্দর ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে এরই মধ্যে শত কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে বেইজিং। তবে এক দশক ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে গদর বন্দর। এর প্রধান কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা সামনে আনছেন বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলা ও পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা।

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইনসি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের গবেষক অ্যাডাম ওয়েইনস্টেইন বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা শুরুতেই কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত তার ওপর নির্ভর করবে পাসনিতে নতুন বন্দর প্রকল্পের সাফল্য। প্রকল্প বাস্তবায়নে আধাআধি মনোভাব নিয়ে কাজ চলবে না এখানে।’

একই মত দেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির পোস্টডক্টরাল ফেলো মুহাম্মদ শোয়েব। তিনি বলেন, ‘এ প্রকল্পে এমন বিনিয়োগকারীই আগ্রহ দেখাবেন, যারা সাহসী, ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ও বিনিয়োগ ফেরত নিয়ে অতটা চিন্তিত নন।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রস্তাবটি বাস্তবে রূপ নিলে পাসনি হবে গদরের কাছেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত অবস্থান। এটি বেইজিংয়ের জন্য নিশ্চিতভাবেই উদ্বেগের কারণ হবে।

ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক হং ঝাং বলেন, ‘এ প্রস্তাব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টা তুলে ধরছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন হোক বা না হোক, রাজনৈতিক বার্তা যথেষ্ট স্পষ্ট।’

তিনি মনে করেন, দুই পরাশক্তিকে একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহারের এ প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে পাকিস্তানে বিনিয়োগের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে মাথায় রাখবে চীন।

মুহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘পাসনির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া প্রস্তাব চীনের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে। একে তো গদরে তাদের বিপুল বিনিয়োগ এখনো প্রত্যাশিত আর্থিক ফল দেয়নি। এখন অনেক প্রচার-প্রচারণা সত্ত্বেও কৌশলগত অংশীদার পাকিস্তান নতুন বিকল্পের দিকে ঝুঁকছে।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তানের খনিজ রফতানির জন্য আরেকটি গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজন কেন। মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক না হলে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গদর বন্দরই এ কাজে ব্যবহৃত হতে পারত।

এদিকে গত সপ্তাহে ভারতকে দেয়া একটি বিশেষ ছাড় বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই ছাড় ভারতকে ইরানের চাবাহার বন্দর পরিচালনা করার সুযোগ দিয়েছিল। বন্দরটি আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য সহজ করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল। একই সময় ট্রাম্প প্রশাসন তালেবান সরকারের কাছে বাগরাম বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ ধারণা করছেন, পাসনি বন্দর হয়তো চাবাহারের বিকল্প হিসেবে আফগানিস্তানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনা করছে।

তবে মুহাম্মদ শোয়েব এ ধারণাকে ‘অবাস্তব’0বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান অতীতে গদরকেও আফগানিস্তানের জন্য কার্যকর করতে পারেনি, পাসনিতেও একই সমস্যার মুখে পড়বে।’

আরও